ওজন কমানোর জন্য যোগ ব্যায়াম করুন

ওজন কমানোর জন্য যোগ ব্যায়াম করুন

প্রাচীন কালে যোগের সৃষ্টিকারী ঋষি পতঞ্জলি (৩০০ খ্রীষ্টপূর্ব) যোগের আটটি ভাগের কথা বলেছিলেন। সগুলো হলঃ যম, নিয়ম, আসন, প্রণায়াম, পত্যাহার, ধর্ম, ধ্যান, এবং সমাধি।  প্রথমটি এবং শেষ দুটির মাধ্যমে মস্তিস্ককে নিযন্থ্রণ করা হয়ে থাকে। এর দ্বারা আমাদের মস্তিস্ক এবং উত্তেজনা কি ভাবে নিয়ন্ত্রণ হয়, তা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। ধ্যানের দ্বারা আমাদের  খাদ্যাভ্যাসও  নিয়ন্ত্রিত হয়।

যোগাসনঃ এটি প্রধানতঃ Yoga Exercise নামেই পরিচিত। এর সাহায্যে আমাদের শরীর সতেজ থাকে, আমাদের মাংসপেশীগুলি শক্তি প্রাপ্ত করে এবং দেহের নির্দিষ্ট অংশের ফ্যাট কমাতে সহায়তা প্রাপ্ত হয়। যোগাসনের দ্বারা যে কেউ তার শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কিছু-কিছু  আসন চোয়ায়ালের, চিবুকের এবং নিতম্বের ফ্যাট কমাতে সাহায্য করে।  এর দ্বারা দেহের অত্যাধিক ওজন কমে.. ফলে সংযুক্ত স্থানগুলি সহজেই নড়া-চড়া করতে পারে, শরীর অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক হয়ে যায়। এই বইতে এমন অনেক আসন দেওয়া হয়েছে, যেগুলো আপনার স্থূলতা কমাতে সাহায্য করবে।

একটি আসন আছে, যার মধ্যে শরীরকে ষোল রকম ভাবে ঘোরাতে-ফেরাতে হয়। এটি স্থূলতা কমানোর সক্ষম ঔষধ।  এটিকে ‘সূর্য প্রণাম’ বলা হয়।  স্থূলতাকমানোর জন্য দিনে দশ বারের বেশী সূর্য প্রণাম করা আবশ্যক। কিন্তু মনে রাখবেন এই আসনটি সর্বদাই একের থেকে শুরু করতে হয়।  এই আসনের  মাধ্যমে যোগ আপনার পথ প্রর্দকের ভূমিকা পালন করে।

প্রাণায়ামঃ ওজন কমানোর জন্য দুই ধরণের প্রাণায়াম খুবই আবশ্যক।  সেই দুটি হল ভস্ত্রিকা এবং কপালভাতি। যে কোন অভ্যাসকারীর ভস্ত্রিকা প্রণায়াম পনেরো মিনিট ধরে অভ্যাস করতে হবে।  এই  সম্পর্কে এই বইতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

যদি প্রতিটি মানুষ এই যোগাসান এবং প্রণায়ামের অভ্যাস করতে পারেন, তবে তাঁরা প্রচুর  সুযোগ প্রাপ্ত করতে পারবেন। এর জন্য কোন অর্থ খরচ হয়ে না। প্রত্যেক মোটা মানুষ দিনে কম পক্ষে ত্রিশ মিনিট ব্যায়াম করা উচিৎ।  এতে তাঁদের ওজন কমবে এবং মানসিক চাপও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

পেটে এবং নিতম্বের অতিরিক্ত ফ্যাট কমানোর জন্য এই আসুনগুলি লাভজনক হয়ঃ

  • ভূজঙ্গানস
  • উত্তান পাদাসন
  • ত্রিকোণাসন
  • পশ্চিমোত্তাসন
  • ভস্ত্রিকা
  • সূর্য প্রণাম

(১) ভূজঙ্গাসনঃ

প্রথম অবস্থানঃ উবু হয়ে বসে পায়ের পাতা সোজা করে মাটিতে মেলে দিন।  হাত শরীর থেকে ত্রিশ  সেমি দূরে রাখুন।

প্রণালীঃ গভীর শ্বাস গ্রহণ করতে-করতে পনেরো সেমি ওপরের দিকে উঠুন।  মুখ দিয়ে শ্বাস ত্যাগ করুন এবং নাভি ভেতরের দিকে ঢোকান।  শ্বাস গ্রহণ করার সময় শরীরের  ভার হাত আর ঊরুর ওপর রাখুন এবং আকাশের দিকে দেখুন।  তারপর ধীরে ধীরে শ্বাস ত্যাগ করে শরীরকে মাটিতে নামিয়ে নিয়ে আসুন।

দ্বিতীয় অবস্থানঃ হাত দুটি শরীর থেকে পনেরো সেমি দূরে রাখুন। প্রণালী আগের মতই।

তৃতীয় অবস্থানঃ  হাত দুটি শরীরের  একেবারে কাছে থাকবে।

প্রণালীঃ শ্বাস নিতে-নিতে শরীর মাটি থেকে পনেরো সেমি ওপরে তুলুন। মুখ দিয়ে ফুঁ বার করুন।  তারপর শ্বাস গ্রহণ করতে-করতে শরীর আরও ওপরে তুলুন, যতে আপনার নাভি ভূমি স্পর্শ করে। ফুঁ দিয়ে শ্বাস ত্যাগ করুন  এবং ধড়কে মাটির ওপর নিয়ে আসুন। মুখের ডান দিকে এবং মাথার ধারে হাত দুটি ছড়িয়ে দিন।  হাতের চেটো দুটি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দিন এবং শরীরকে শিথিল করে বিশ্রাম করুন।

(২) উত্তান পাদাসনঃ

প্রথম অবস্থানঃ চিৎ হয়ে শুন.. আঙ্গুলগুলি আটকে নিয়ে হাত ঘাড়ের নীচে নিয়ে যান।  কনুই মাটিতে রাখুন এবং দু পায়ের মধ্যে পনেরো সেমি দূরত্ব রাখুন।

প্রণালীঃ শ্বাস-প্রশ্বাস ত্যাগ এবং গ্রহণের  মধ্যে দিয়েই পা দুটি মাটি থেকে পনেরো সেমি ওপরে তুলুন।  পাঁচ  মিনিট ধরে ম্বাস নিন আ ছাড়ুন এবং তারপর শ্বাস ছাড়তে-ছাড়তে পা নীচে নামান।

দ্বিতীয় অবস্থানঃ  দু-পায়ের মধ্যে পঁচিশ সেমি দূরত্ব রাখুন।

প্রণালীঃ গোড়ালী বাইরের দিক এবং পায়ের পাতা ভেতরের  দিকে রাখুন। পা  দুটি মাটি থেকে পনেরো সেমি ওপরে তুলুন।  পাঁচ মিনিট ধরে শ্বাস-প্রঃশ্বাস গ্রহণ এবং ত্যাগ করুন। গভীর শ্বাস গ্রহণ করতে –করতে পা নীচে নামান এবং ত্যাগ করে বিশ্রাম করুন।

তৃতীয় অবস্থানঃ  দু পায়ের মধ্যে পয়তাল্লিশ সেমি দূরত্ব রাখুন।

প্রণালীঃ একই প্রক্রিয়ার  পনরাবৃত্তি করুন এবং বিশ্রাম করুন।

(৩)

ত্রিকোণাসনঃ দু পা ফাঁক সোজা দাঁড়িয়ে যান। ডান পা-কে ডান দিকে ঘোরান আর হাত দুটিকে কোনাকুনি বর্ধিত করুন এবং এমন ভাবে রাখবেন, যাতে সোজাসুজি থাকে। ডান দিকে বেকুন এবং সেই ভাবে হাটুকে বাকান। ডান হাত ডান পায়ের কাছে নিয়ে আসুন এবং হাত দুটিকে সোজাসুজি রাখবেন।  বা হাতের পাতা সোজা করে রাখুন এবং  বাঁ হাতের প্রান্ত ভাগটির দিকে তাকান।

একেবারে প্রথম অবস্থানে ফিরে আসুন এবং উল্টো দিক থেকেও  একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করুন।

(৪)

পশ্চিমোত্তাসনঃ

অবস্থানঃ  মাটিতে বসে পা ছাড়িয়ে দিন। পায়ের পাতাকে প্রসারিত করুন এবং শরীর থেকে  যতটি সম্ভব  দূরে রাখুন।

প্রণালীঃ শ্বাস গ্রহণ করতে-করতে হাত দুটিকে ওপরের দিকে তুলুন। হাত দুটি এমন ভাবে রাখবেন, যাতে তা কান স্পর্শ করে।  শ্বাস ত্যাগ করতে করতে হাত দুটিকে নীচের  দিকে নিয়ে আসুন এবং তর্জনী দিয়ে পায়ের অঙ্গুল স্পর্শ করার চেষ্টা করুন।  এমন করার পর হাত দিয়ে গোড়ালি টানার চেষ্টা করুন এবং কনুই মাটিতে স্পর্শ করুন। মাথা নীচু করে তা হাটু স্পর্শ করার চেষ্টা করুন।  এমনটা দু- থেকে  তিন বার করতে থাকুন।

(৫) ভস্ত্রিকাঃ

ভস্ত্রিকার অর্থ হল ’গর্জন’ এতে শ্বাস এবং প্রঃশ্বাসের  মধ্যে খুব জোরে আঘাত লাগে। পদ্মসানে বসুন।  শরীর, মাথা এবং ঘাড় সোজা রাখবেন। মুখ বন্ধ রাখুন। কামারশালার হাপড়ের মতন শ্বাস গ্রহণ করুন এবং ত্যাগ করুন।  এই প্রণায়াম করার সময় মুখ থেকে আওয়াজ নির্গত হয়। অভ্যাসকরীকে বলপূর্বক শ্বাস-প্রঃশ্বাসে ধাক্কা লাগানোর  চেষ্টা করতে হবে।  লাগাতার দশ বার এমনটা কারার পর গভীর শ্বাস গ্রহন করুন।  যতক্ষন পারবেন, দম বন্ধ করে রাখুন এবং তারপর দ্বিতীয় চক্র শুরু করুন।  আপনি সকাল-সন্ধ্যায় তিনটি করে চক্র সম্পূর্ণ করতে পারেন। ব্যস্ত ব্যক্তিদেরও কম পক্ষে একটা চক্র করা উচিত। এর সাহায্য  তাঁরা সম্পূর্ণ তরোতাজা থাকতে পারবেন।

(৬) সূর্য প্রণামঃ  এতে ষোল টি গতিবিধির মিশ্রণে সাত  রকম যোগের মিলন রয়েছে।

অবস্থানঃ দুটি পা জুড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান। হাত দুটি জোর করে বুকের সাথে লাগিয়ে রাখুন এবং বুড়ো আঙুল যাতে এ্যাডামস আপেল স্পর্শ করে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন এবং  মাথাটি সামান্য সামনের দিকে ঝোকান, যাতে তর্জনী আপনার কপালের জ্যোতি কেন্দ্র স্পর্শ করে।

  • শ্বাস গ্রহণ করুন। হাত দুটি কান স্পর্শ করে ওপরের দিকে তুলুন, শ্বাস ছেড়ে দিন।
  • শ্বাস নিতে-নিতে হাত দুটিকে কাধের সোজাসুজি ছড়িয়ে দিন।
  • পা দুটি মাটিতে রেখে কোমর সোজা রাখুন। শরীরের ওপরের অংশ নীচের দিকে ঝোকান।
  • হাত দুটিকে কান স্পর্শ করে ওপরের দিকে নিয়ে যান।
  • শ্বাস ত্যাগ করে নীচের দিকে ঝুকুন এবং কপাল দিয়ে হাটু ছোওয়ার চেষ্টা করুন।  হাত দুটিকে পায়ের কাছে মাটিতে স্পর্শ করুন।  হাঁটু সোজা রাখবেন এবং পেটকে ভেতরের দিকে ঢোকান।
  • গভীর শ্বাস গ্রহণ করুন এবং বাঁ পেছেনের দিকে নিয়ে যান এবং হাত এই ভাবেই মাটিতে ছুয়ে রাখুন।
  • নীচের দিকে ঝুকুন। শ্বাস ছাড়তে-ছাড়তে কপাল মাটিতে স্পর্শ করান।
  • শ্বাস নিন এবং মাথা ওপরের দিকে তুলে আকাশের দিকে দেখুন।
  • ডান পা-কে বাঁ পায়ের বরাবর প্রসারিত করুন এবং শরীরকে মাটির সমান্তরালে রাখুন। এই সময হাতের চেটো আর পায়ের  আঙ্গুল এর ওপরে শরীরের ভার রাখুন।
  • হাত এবং চেটোকে এই ভাবেই রাখুন। শ্বাস গ্রহণ করতে করতে নিজের হাত ভাজ করুন এবং শরীরের ওপরের দিকের অংশকে মটিতে স্পর্শ করান। মাথা, বুক এবং হাটু মাটি স্পর্শ করবে।  নিতম্ব উচুলে তুলে রাখুন এবং শ্বাস ছাড়ুন।
  • শ্বাস গ্রহণ করার সময় হাতের চেটো এবং পায়ের পাতার সাহায্যে শরীরকে ওপরের দিকে ওঠান। কোমরের অংশকে নীচের দিকে আনার সময় শ্বাস বন্ধ রাখুন এবং আকাশের দিকে দেখুন।
  • শ্বাস ত্যাগ করুন, নিতম্বকে ওপর দিকে তুলুন এবং মাথা নামিয়ে নাভিকে দেখার চেষ্টা করুন।
  • ডান পা- কে দুটো হাতের মধ্যে রাখুন এবং নীচে ঝুঁকে পড়ে কপাল দিয়ে মাটি স্পর্শ করার চেষ্টা করুন।
  • শ্বাস গ্রহণ করতে-করতে ধড় ওপরের দিকে তুলুন এবং আকাশের দিকে দেখুন।
  • বাঁ পা- ডান পায়ের দিকে নিয়ে আসুন। পঞ্চম অবস্থানের মত কপাল হাঁটুতে স্পর্শ করান এবং হাত পায়ের দু দিকে রাখুন। তারপর শ্বাস ত্যাগ করুন।
  • শ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ুন। হাত দুটিকে প্রথম অবস্থানের মত বুকের সঙ্গে ঠেকান।  তারপর শুয়ে বিশ্রাম করুন।