গুরু পুষ্টি

গুরু পুষ্টি (Macronutrients)

প্রশ্নঃ কোলেষ্ট্রল বলতে কি কোথায় ?

উত্তরঃ এটি হচ্ছে শরীরের রক্ত কোষ গুলির মধ্যে প্রাপ্ত নরম মোমের  মতন একটি পদার্থ। এটি সুস্থ শরীরের একটি আঙ্গ হয়.. কারণ এটির দ্বারা কোষের আস্তরণ, কিছু হর্মোন এবং প্রয়োজনীয় কিছু কোষ উৎপন্ন হয়। ‍যদি রক্তে এর প্রভাব বৃদ্ধি পায়, তবে হার্ট এ্যাটাকের সম্ভাবনা দেখতে পাওয়া যায়। এর ফলে ষ্ট্রোকও হতে পারে। শরীরে দুই ধরণের  কোলেষ্ট্রল পাওয়া যায়।  কিছুটা অংশ শরীরেই তৈরী হয় এবং কিছুটা অংশ পশুদের শরীর থেকে প্রাপ্ত ফ্যাটের সাহায্যে পাওয়া যায়, যেমন- মাছ,মাংস, ডিম, দুধ, মাখন, এবং পনীর। ফল সবজি, এবং দানা শষ্যে কোলেষ্ট্রল থাকে না।  আমরা নিজের রোগীদের আহার থেকে কোলেষ্ট্রল কমানোরই পরামর্শ দেই।

 

প্রশ্নঃ ট্রাইগ্লিসরাইড কি ?

উত্তরঃ ফ্যাটের অপর নামই হল ট্রাইগ্লিসরাইড। আমাদের ফ্যাটের নিরানব্বই ভাগ  ট্রাইগ্লিসরাইড এবং এক ভাগ হচ্ছে কোলেষ্ট্রল। বনষ্পতি থেকে প্রাপ্ত ফ্যাট যেমন- সূর্যমুখী, জলপাই, পাম ওয়েল, নারকেল তেল, সূর্যে, বনস্পতি এবং বাদাম তেল ট্রাইগ্লিরাইজড ছাড়া আর কিছুই নয়।  বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলা যায়, এতে এক অণু গ্লাইসিরোল এবং তিন অণু ফ্যাটি এ্যাসিড থাকে।  এটি শরীরেকে শক্তি প্রদান করে। এক গ্রাম থেকে নয় ক্যালোরী পাওয়া যায়। প্রতি একশ এম,আই রক্তে ট্রাইগ্লিসরাইডের সাধারণ স্তর হল চল্লিশ থেকে একশ ষাট  গ্রাম।  যদি এই স্তর চূড়ান্ত সীমায় পৌছায় আর্থাৎ  একশ মিলি যদি একশ গ্রাম ট্রাইগ্লিসরাইড থাকে, তবে তা ধমনীর মধ্যে  একত্রিত হয়ে জমাট বাঁধে এবং হৃদরোগের আশঙ্কা দেখা যায় এবং ব্যক্তিকে হার্ট এ্যাটাকের সম্মুখীন হতে হয়।

’সাওল’ নিজের রোগীদের এই স্তর একশ ত্রিশ গ্রাম/ একশ মিলি রাখার পরামর্শ দেয়।

 

প্রশ্নঃ  কার্বোহাইড্রেট কাকে বলে ?

উত্তরঃ  এটি কার্বন, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের সংমিশ্রণে তৈরি হয়। এটি শরীরের তাপ বজায় রাখার জন্য জ্বালানীর কাজ করে এবং খেলার সময় শক্তি প্রদান করে।  এটি সাধারণ এবং জটিল- দুই ভাবে প্রাপ্ত হয় এবং খাদ্য মধ্যস্থ শক্তির প্রধান উৎস হয়।  এর এক গ্রাম থেকে চার ক্যালোরী পাওয়া যায়। ফল, সবজি এবং মধুতে গ্লুকোজ বা ফ্রক্টোজ, চিনিতে সুক্রোজ, দুধে ল্যাক্টোস এবং পশুদের থেকে প্রাপ্ত  খাদ্য গ্লাইকোজেন নামক সাধারন কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যায়। সবজি, ফল এবং দানা শস্য থেকে প্রাপ্ত সেললোজ মিশ্রিত কার্বোহাইড্রেট ফাইবার এর অভাব পূরণ করে।

 

প্রশ্নঃ সাধারণ কার্বোহাইড্রেট কাকে বলে ?

উত্তরঃ যখন গ্লুকোজ এর এককগুলি একটা লম্বা চেনের সাহায্যে ‍যুক্ত থাকে, তখন তাকে সাধারণ কার্বোহাইড্রেট বলা হয়।  এটি পাচনতন্ত্রে দিয়ে শীঘ্রেই  মিশে যায়.. যার থেকে গ্লুকোজ  নির্গত হয় এবং তা রক্তের মধ্যে মিশে রক্তে গ্লুকোজের  স্তরকে গ্লুকোজ এর স্তরকে বৃদ্ধি করে। উদাহরণ স্বরুপ চিনি, গুড়, মিষ্টি, চকোলেট, জ্যাম, জেলি এবং কোল্ড ড্রিঙ্ক।  মিষ্টি ফল এই শ্রেণীতেই পড়ে।  স্থূল ব্যক্তিদের এর থেকে দূরে থাকা উচিত।

 

প্রশ্নঃ জটিল কার্বোহাইড্রেট কাকে বলে  ?

উত্তরঃ এই ক্ষেত্রে গ্লুকোজের  এককগুলি জটিল প্রক্রিয়ায় সজ্জিত থাকে। এটি পাচনতন্ত্রে গিয়েই মিশে যায় না, এর থেকে ধীরে-ধীরে গ্লুকোজ তৈরি হয় এবং রক্তে গ্লুকোজ এর মাত্রা বৃদ্ধি করে না। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, সাদা ভাত, ডাল, ব্রাউন ব্রেড, সবজি এবং ফল (মিষ্টি ফল নয়)।  মোটা ব্যক্তিরা এগুলি গ্রহণ করতে পারেন।

প্রশ্নঃ পাচনতন্ত্রে কার্বোহাইড্রেট কি ভাবে ভাঙ্গে  ?

উত্তরঃ  আমাদের লালা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত পাক রস পাচনশীল  কার্বোহাইড্রেটকে  সাধারণ কণায় পরিবর্তিত করে এবং এটি রক্তে প্রবাহ মিশে যায়।  রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে এই গ্লুকোজ যকৃত যায়, যেখানে এটি একত্রিত হয়ে শক্তি রূপে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।

প্রশ্নঃ প্রোটিন কাকে বলে ?

উত্তরঃ কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেনের সংমিশ্রণে প্রোটিন উৎপন্ন হয়।  এটিকে ’নাইট্রেজেন ফুড’ ও বলা হয়ে থাকে। এটি শরীরের জীবিত কোষগুলোকে ঠিক রাখে এবং কোষ নির্মাণেও সাহায্য করে । মাংসপেশী, গ্ল্যান্ড, নার্ভ এবং শরীরের বিভিন্ন কাজে যুক্ত বিভিন্ন অঙ্গ প্রোটিন থেকেই তৈরি হয়।

প্রতিটি জীবিত কোষের কাজ এবং তাদের নির্মাণের  জন্য প্রোটিন আবশ্যক হয়। আমাদের শরীর মধ্যস্থ প্রোটিনের অর্ধেক ভাগ মাংসপেশীর  রূপে এবং বাকী ভাগ হাড়, চামড়া এবং অস্থির রূপে থাকে।  বিভিন্ন  ধরণের  এ্যামিনো এ্যাসিড আছে, যেগুলো অত্যাবশ্যক হওয়া সত্বেও শরীর উৎপন্ন হয় না..  সেগুলো প্রোটিন থেকেই তৈরি হয়।  প্রোটিন শরীরে প্রচুর কাজ করে এবং এর প্রতি গ্রাম থেকে চার ক্যালোরী শক্তি পাওয়া যায়। পশুদের থেকে প্রাপ্ত মাংস, দুধ, ঘি, মাছ এবং ডিম হচ্ছে প্রোটিনের সব থেকে ভালো উৎস।  এই প্রোটিন এর থেকেই সঠিক মাত্রায়ে এ্যামিনো এ্যাসিড উৎপন্ন হয়। উন্নত মানের প্রোটিন পাওয়ার জন্য শস্য, মিলেট, বাজরা  এবং ডাল মিশ্রিত করে খাওয়া উচিত.. এগুলি একে অপরের পরিপুরক হয়।

প্রশ্নঃ পাচনতন্ত্রে প্রোটিন কি ভাবে ভাঙ্গে ?

উত্তরঃ  মাংস, ডিম, এবং বীনসে অবস্থিত প্রোটিনের বড় অণুগুলিকে পাচক রস পাচিত করে দেয়, যাতে সেগুলি শরীরের কোষগুলির দেখাশোনা করতে পারে এবং তা নির্মাণ করতে পারে। এঞ্জাইমের রস প্রোটিনকে পরিচিত হয়।  অগ্নাশয় রস এবং ক্ষুদ্রান্তের প্রোটিন পাচিত হয়। অগ্নাশয় রস এবং ক্ষুদ্রান্তের অনেক এঞ্জাইম প্রোটিন এর  অণুগুলিকে এ্যামিনো এ্যাসিডে পরিণত করে। এই ছটো অণুগলি রক্তে মিশে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌছে যায় এবং কোষ প্রাচীর এবং কোষের অন্যান্য অঙ্গ তৈরী করে।

প্রশ্নঃ নিরমিষ এবং আমিষ প্রোটিনের মধ্যে পার্থক্য কি ?

উত্তরঃ নিরামিষ এবং আমিষ প্রোটিনের মধ্যে পার্থক্য আছে। নিরামিষ প্রোটিন বনষ্পতি উৎস থেকে এবং আমিষ প্রোটিন পশুদের থেকে প্রাপ্ত খাদ্যের মধ্যে দিয়ে পাওয়া যায়।  আমিষ প্রোটিনকেই বেশী ভালো বলে মনে করা হয়.. কারণ এতে শরীর এর জন্য সমস্ত রকম প্রয়োজনীয়  এ্যামিনো এ্যাসিড পাওয়া যায়.. অন্য দিকে নিরামিষ প্রোটিন থেকে কোন রকম এ্যামোনো এ্যাসিড পাওয়া যায় না। যদিও পরিপূরক দানা শস্য গ্রহণ করেল এর অভাব দূর করা যেতে পারে এবং উন্নত মানের প্রোটিন পাওয়া যায়।

প্রশ্নঃ পাচনতন্ত্রে ফ্যাট কি ভাবে ভাঙ্গে ?

উত্তরঃ ফ্যাটের অণুই শরীরের শক্তির প্রধান উৎস হয়। আন্ত্র মাখনের মতন ফ্যাটগুলোকে পাচিত করে জলীয় তত্ত্বে পরিবর্তিত করে। যকৃত থেকে যে পিত্ত রস নিঃসৃত  হয়, তা প্রাকৃতিক ডিটারজেন্ট ফ্যাটের বড় অণুগুলিকে এ্যামিনো এ্যাসিড এবং কোলেষ্ট্রল এর ছোট অণুতে পরিবর্বিত করে দেয় .. সেখান থেকে এই অণুগুলি শ্লৈষ্মিক কোষ পাঠান হয়। এই কোষগুলিতে ছোট অণুগুলি পুনরায় বড় আকার ধারণ করে.. যার মধ্যে বেশীর ভাগ আন্ত্রের লসিকায় চলে যায়। এই ছোট বাহিকাগুলি প্রস্তুত ফ্যাটের অণুগুলিকে রক্তে নিয়ে যায় এবং রক্তের মাধ্যমে এগুলি শরীরের ফ্যাট ভান্ডারে চলে যায়।

প্রশ্নঃ একগ্রাম কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং ফ্যাটের থেকে কত ক্যালোরী পাওয়া যায় ?

উত্তরঃ এক গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থেকে চার ক্যালোরী, এক গ্রাম প্রোটিন থেকে চার ক্যালোরী এবং একগ্রাম ফ্যাট থেকে নয় ক্যালোরী পাওয়া ফ্যাট ভান্ডারে চলে যায়।

প্রশ্নঃ দৃশ্য এবং অদৃশ্য ফ্যাট বলতে কি বোঝায় ?

উত্তরঃ দৃশ্য ফ্যাটকে খালি চোখে দেখা যায়.. কিন্তু অদৃশ্য ফ্যাটকে খালি চোখে দেখা যায় না।

উদাহরণ স্বরূপঃ

দৃশ্য ফ্যাটঃ ঘি,মাখন, বাদাম, সর্ষে, নারকেল এবং সূর্যমুখী  থেকে প্রাপ্ত তেল।

অদৃশ্য ফ্যাটঃ  দানা শস্য, ডাল, বেগুন, মূলো আপেল, কলা প্রভৃতি।

প্রশ্নঃ এমন খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করুন, যাতে ফ্যাট থাকবে না।

প্রত্যেক ১০০ গ্রাম খাদ্যে অবস্থিত অদৃশ্য ফ্যাট

  • বাজরা -০৫
  • ভুট্টা – ৩.৬
  • চাল- ০.৫-১
  • গম – ১.৫
  • বেসন- ৫.৩
  • কড়াইশুটি-০.১
  • রাজমা -১.৫
  • সবুজ পাতা-০.১-০.৫
  • গাজর-০.২
  • পেয়াজ-০.১
  • আলু-০.১
  • মূলো-০.১
  • বেগুন-০.৩
  • ফুলকপি-০.৪
  • কাঁচা আম-০.১
  • টম্যাটো-০.১
  • কাঁচা লঙ্কা-০.১
  • তাজা নারকেল -৪১
  • নারকেলের জল -০৬
  • আমন্ড -৫৮.৯
  • কাজু -৪৬.৯
  • বাদাম- ৪০.১
  • আপেল-০.৫
  • কলা – ০.৩
  • খেজুর – ০.৪
  • চিনি – ০০
  • মধু – ০০
  • ঘি এবং সব ধরনের তেল১০০%