Posted on

পেটের ভিতর যক্ষা হয়

পেটের ভিতর যক্ষা হয়

 

যক্ষা বলতে আমরা সাধারণত ফুসফুসের যক্ষাই বুঝি। আসলে ফুসফুসসহ শরীরের এমন কোন অঙ্গ নেই সেখানে যক্ষা হয় না। শরীরের অন্যান্য অঙ্গে র মত পেটের যে কোন অংশেও যক্ষা হতে পারে। সাধারণত পেটের যেসব অংশে যক্ষা হতে পারে সেগুলো হলো পেটের পর্দা, খাদ্যনালী, যকৃৎ, পিত্তনালী অগ্নাশয় এবং মুত্র ও জননেন্দ্রিয় নালী। এছাড়া কিডনির উপরিভাগের এডরেনাল গ্ল্যান্ডেও যক্ষা হতে পারে। শুধু প্রাপ্ত বয়স্কদের নয় শিশুরও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তিন ভাবে মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। ১। যক্ষা আক্রান্ত গরুর দুধ ভালভাবে ফুটিয়ে না খেলে। ২। যক্ষা জীবানু সংক্রমিত খাদ্য অথবা পানীয় গ্রহণ এবং যক্ষা জীবানু সংক্রমিত চামচ বা আঙ্গুলের সাহায্যে খাদ্য খেলে। কফে জীবানু আছে এমন যক্ষা রোগী যখন অসাবধানতার সাথে খালিমুখে কাশি দেয় এবং কফ ফেলে সেখান থেকে এই সংক্রমণের উৎপত্তি হয়। ৩। ফুসফুস থেকে যক্ষা জীবানুর আছে এমন ফুসফুসের যক্ষা রোগী যদি কফ বাইরে না ফেলে সরাসরি গিলে ফেলে সেক্ষেত্রেও পেটের যক্ষা হতে পারে।

পেটের ভিতর যক্ষা হয়
পেটের ভিতর যক্ষা হয়

মেয়েদের বেলায় ফেলোপিয়ান টিউব এবং ওভারীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তারা বন্ধ্যা হয়ে যায। রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে যক্ষা জীবানু এডরেনাল গ্রন্থিতে প্রবেশের কারণে এডরোনালে যক্ষা হয়। শিশুদের অন্ত্রে যক্ষা জনিত ঘা খুব কমেই হয়ে থাকে।

লক্ষণসমূহঃ

পেটে যক্ষা জীবানু প্রবেশের পর কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে ধীরে ধীরে এ  রোগের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। পেটে পানি জমার কারণে পেট ফুলে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জ্বর, ওজন হ্রাস, পেটে ব্যথা বা পেটে হাত দিলে রোগী ব্যথা অনুভব করে। হৃদরোগ ও কিডনিরোগেও পেটে পানি জমতে পারে বিধায় পেটে পানি জমা রোগীদের যক্ষা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের হৃদরোগ বা কিডনি রোগ আছে কি না ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখা উচিত। পেটের যক্ষায় আক্রান্ত রোগীদের শতকরা ২৫ থেকে ৫০ ভাগ রোগীর পেটের আবরণ সংক্রমিত হয়। এসব রোগীর শতকরা ২০ ভাগের ডায়রিয়া হয়। পেটের যক্ষা আক্রান্ত রোগীদের প্রায় অর্ধেক রোগীরা বুকেও যক্ষা হতে পারে। এ ধরনের যক্ষার সাথে এইচ আইভির সম্পর্কতা থাকতে পারে। সাধারণত বৃহদান্ত্র ও ক্ষুদ্রান্তের চেয়ে পাকস্থলির উপরিভাগের খাদ্য নালীতেও এ রোগ কম হয়। যে সব রোগীর খাদ্য গিলতে কষ্ট এবং গলা দিয়ে সামান্য রক্তক্ষরণ হয় তাদের ইসোফেগাস টিবি আছে বলে সন্দেহ করা যায়। এইচআইভি রোগীর ক্ষেত্রে এটা প্রকট আকারে দেখা যায়।

পাকস্থলীর যক্ষাও খুব কদাচিৎ হয়। পাকস্থলীর যক্ষা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে অনেকেই এটাকে পেপটিক আলসার বলে ভুল করে। একইভাবে ডিউডোনালের যক্ষাকেও অনেকে পেপটিক আলসা, টিউমার ও ক্রন্স ডিজিজ বলে ভুল করে। পেটের পর্দা ও খাদ্যনালীর যক্ষায় অথবা যকৃতের কোন অসুখের কারণে যকৃত (লিভার) বড় হয়ে যেতে পারে। পেটের যক্ষায় প্লীহা বড় হতে দেখা যায়।   এইচআইভি আক্রান্ত যক্ষারোগীদের প্লীহা বড় হতে পারে। অগ্নাশয়ের যক্ষা খুব কদাচিৎ হয় কিন্তু অগ্নাশয়ে যক্ষা হলে তীব্র অগ্নাশয় সংক্রমনের লক্ষণ দেখা দেয়। যক্ষায় পেটের পিছন দিকের পেশি এবং তার সাথে মেজেন্টারিক লিম্প গ্রন্থি পেকে ফেপে ফোড়ার মত আকৃতি ধারণ করে এবং টিউমারের মত হতে পারে।

ডায়াগনোসিস/ রোগ নির্ণয়ঃ

পেটের যক্ষা নির্ণয়ের অনেক সময়ই ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। উন্নত দেশে পেট খুলে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে পরীক্ষা নিরীক্ষার উন্নত পদ্ধতি না থাকায় রোগকে গভীরভাবে অবলোকনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়া হয়। সাধারণত এক্সরে করলে সোয়াস মাসেলে ঘা দেখা যায় এবং পাশাপাশি বুকের এক্সরে করলে দেখা যাবে পূর্বে রোগীর যক্ষা ছিল বা এখনও যক্ষা আছে। ধারণা করা হয়,  সোয়াস মাসেলের এই ঘা যক্ষাজনিত। শিশুদের ক্ষেত্রে এমনটি রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে। আল্ট্রা সাউন্ড স্ক্যানের মাধ্যমে দেখা যায় পেটের নাড়ী মোটাহয়ে জট পাকিয়ে গেছে। মেডিস্টাইনাল লিম্প নোড বড় হয়ে গেছে অথবা লিভার ও প্লীহায় কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এমনটি হলে এটাকে পেটের যক্ষা বা অ্যাবডোমিনাল টিবি বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। পেটে জমাকৃত পানি সেন্টিফিউজ করে কালচার করলে যক্ষা জীবাণু পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া পেটের পর্দার বায়োপসি করলে নিশ্চিতভাবে পেটের যক্ষা নির্ণয় সম্ভব হয়। পেটের এই পানিতে মোট প্রোটিন এবং এলবোমিনের পরিমাণ  এবং এলডিএইচ এর পরিমাণও অনেকাংশে পেটের পর্দার যক্ষা নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এডিনোসিন ডি এমাইনিজের উপস্থিতিও এই রোগ নির্ণয়ে যথেষ্ট সাহায্য করে। লক্ষণ দেখেই খাদ্য নালীর যক্ষা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অনেক সময় ক্লিনিক্যাল, রেডিওলজিক্যাল এবং এন্ডোসকপি করেও সঠিকভাবে এ রোগ নির্ণয় করা যায় না। এক্ষেত্রে চিকিৎসককে পেস্টুরোলা আমাশয় নিপ্লাজম এবং গ্যাস্ট্রে ইনটেস্টিনাল হিস্টো প্লাজমোসিস এর কথা বিশেষভাবে বিবেচনায় আনতে হবে। সাধারণ এন্ডোসকপিতে কোন যক্ষা জীবানু পাওয়া যায় না তবে ঘায়ের প্রান্তিক অংশ থেকে বায়োপসি করে পরীক্ষা করলে যক্ষা জীবানু পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এডরোনাল গ্ল্যান্ডে যক্ষা আক্রান্ত রোগীর এক্সরে করলে এডরেনাল গ্ল্যান্ড এলাকায় কাল দাগ দেখা যায়। এডরেনাল গ্ল্যান্ড সাধারণ স্ফীত হয়। আল্ট্রাসাউন্ড বা টমোগ্রাফি করলে এটা দেখতে পাওয়া যায়।

চিকিৎসা

এসব লক্ষণ দেখা গেলে ৬ মাস যক্ষার চিকিৎসা দিলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। পেটের ভিতরকার দলা বা পিন্ড দ্রুত আরোগ্য হয়। পেটের যক্ষা নিরাময় হলেও পেটের প্যাচানো নাড়ীগুলো জট পাকিয়ে যেতে পারে,  এর ফলে অন্ত্রে বাধা সৃষ্টি হয় এবং এ বাধা অপসারণেল জন্য শৈল্য চিকিৎসার ( সার্জারি) প্রয়োজন হতে পারে। কারণ,  এই পানি পেটে চাপ সৃষ্টি করে। এ ধরনের অসুবিধা হলে যক্ষার ওষুধেল সাথে প্রেডলোসলন দেয়া যেতে পারে। প্রেডলোসলন দেয়া হলে পানি দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে আর নাড়ী জোড়া লাগে না ফলে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় না। এডরোনাল গ্ল্যান্ডের যক্ষায় যক্ষার ওষুধের সাথে এলডোসটেরেন হরমোনোর ঘাটতি পুরণ জরুরি।

 

ডা. একেএমডি আহসান আলী

যক্ষা ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ