Posted on

ফুসফুস রোগে শ্বাসকষ্ট

ফুসফুস রোগে শ্বাসকষ্ট

ইন্টারস্টিসিয়াল লাঙ্গ ডিজিজ বা আইএলডি নামে একটি বক্ষ্যবাধি রয়েছে। রোগটি বর্তমানে খুবই প্রচলিত। যদিও শ্বাসকষ্ট থাকায় রোগীরা  একে সাধারণ হাপানি বলে মনে করেন।  এ রোগটি অনেক সমস্যার জন্য হয়ে থাকে। লক্ষণ, উপসর্গ,  রোগের ধরণ এবং এক্সরের পরিবর্তনগুলো খুব একটা ঘনিষ্ট নয়,  তবে, শ্বাসকষ্ট খুব বেশি থাকে। এক্সরে পরীক্ষা করলে দেখা যায় যে,  রোগীর সাধারণ হাপানিতে ভুগছে না এবং এতে এই রোগের আলমত চোখে পড়ে। কোনো কোনো রোগীকে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করলে কারণ দেখা যায়। পেশাগত কারণে ধুলোবালি ফুসফুসে ঢুকে নিউমোকোনিওসিস  সৃষ্টি  করে। নাক দিয়ে জৈব এন্টিজেন যেমন- পাখির পশম/ পালক ঢুকে এক্সটনসিক অ্যালার্জিক এলডিওলাইটিস রোগের সৃষ্টি করে। কিছু কিছু ওষুধ গ্রহণে/ সেবনের ইতিহাস থাকে, যার ফলে ফুসফুসে ফাইব্রোসিস সৃষ্টি হয়। ফুসফুসে কিছু পরিচিত ধরনের ক্যান্সার যেমন- লিউকোমিয়া বা লিমফোমার জটিলতায় এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে ইন্টারস্টিলিয়াল লাঙ্গ ডিজিজ রোগটির প্রধান কারণ ক্রিপটোজনিক ফাইব্রোসিং এলভিওলাইটিস। এই সমস্যাটি ফুসফুসের অভ্যান্তরীন কাঠামোগত ব্যাপক পরিবর্তন আনে,  যেমন- প্রদাহ,  এবং ফাইব্রোসিস একসাথে ঘটতে থাকে। ক্রিপটোজেনিক ফাইব্রেসিস এলবিওলাইটিস নিজে নিজেই হতে পারে অথবা তার সাথে বিভিন্ন ধরনের রক্তনালীর কোলাজেন রোগসমূহ থাকতে পারে। এই সমস্যাটি বর্তমানে প্রতি ১ লাখে ১০ জনের উপরে বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবছর ১২০০ রোগী এই রোগে মৃত্যুবরণ করেন। এই রোগটি পুরুষের মধ্যে বেশি দেখতে পাওয়া যায়। যদিও যে কোনো বয়সেই   এই রোগটি দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণত ৫০-৬০ বছরের মধ্যে এটা দেখা দেয়। অনেক সময় এটা বংশগতও হতে পারে। এ রোগটি কিভাবে দেহে শুরু হয় তা এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। ধারণা করা হয় যে, প্রতিরোধ ব্যবস্থা,  প্রদাহজনিত কারণে কোষের ধ্বংস হওয়া এবং কোলাজেন জমে থাকা নিয়ে এ রোগ হয়ে থাকে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সামান্য ফ্লু ধরনের অসুস্থতা নিয়ে রোগ শুরু হয় যদিও জীবানু সংক্রমণের লক্ষণ প্রথম ধরা পড়ে না। এটা ধরে নেয়া হয় যে, প্রথমে পদ্রাহ হয় এবং পরে ফাইব্রোসিস ঘটতে থাকে।

ফুসফুস রোগে শ্বাসকষ্ট
ফুসফুস রোগে শ্বাসকষ্ট

উপসর্গঃ  রোগী প্রথমে চিকিৎসকের কাছে আসে শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে,  যা পরিশ্রম বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। অনেক রোগীরই কষ্টদায়ক কাশি থাকে। কাশির সাথে কফ উঠে না। শ্বাসকষ্টের সাথে হাত পায়ের জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা অর্থ্যাৎ আথ্রাইটিস থাকতে পারে। ফুসফুস পরীক্ষা করলে নীচের দিকে মৃদু ঘড় ঘড় শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। যদিও পরের দিকে ফুসফুসের সব জায়গাই এই শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। শতকরা ৬৬-৮৩ ভাগ রোগীর বেলায় হাতের আঙ্গুলের মাথা মোট হয়ে যায়। যাকে আমরা ক্লাবিং বলি। অনেক সময় একটু বেশি পরিশ্রম করলে ঠোট,  জিহ্বা নীলবর্ণ ধারণ করে।

শেষের পর্যায়ে ফুসফুসের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কারণে হার্ট ফেলিওর দেখা দেয়। রক্ত পরীক্ষায় খুব একটা কিছু ধরা পড়ে না। যদিও রক্তের ইএসআর খুব একটা কিছু ধরা পড়ে না। যদিও রক্তের ইএসআর খুব বেড়ে যায় এবং রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। রোগের শেষের দিকে তীব্র শ্বাসকষ্টের জন্য রক্তের লোহিত কণিকার সংখ্যা বেড়ে পলিসাইথেমিয়া ঘটাতে পারে। আনুমানিক ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে রক্তে রিউমেটয়েড ফ্যাক্টর অথবা এন্টিনিউক্লিয়ার ফ্যাক্টর পজেটিভ হতে পারে। এই রোগ নির্ণয়ে সাধারণ বুকের  এক্সরের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এক্সরেতে অসংখ্য দাগ দেখতে পাওয়া যায় এবং ফুসফুস দুটির আয়তনও ছোট হয়ে যায়। এই পরিবর্তনগুলো প্রথমদিকে ফুসফুসের নীচের দিকে এবং ধারের দিকে দেখতে পাওয়া যায়। যদিও শেষের পর্যায়ে পুরো ফুসফুস জুড়েই ক্ষুদ্র অসংখ্য দাগ চোখে পড়ে। কোনো কোনো রোগীর  এক্সরে স্বাভাবিক থাকে,  যদিও সিটি স্ক্যান করলে রোগ ধরা পড়ে। উন্নত দেশে রেডিও নিউক্লাডি স্ক্যানিং করা হয়। আমাদের দেশে এখন পালমোনারী ফাংশন পরীক্ষা আমরা নিয়মিত করে থাকি। এই পরীক্ষা হাপানি এবং এই রোগ পার্থক্যকরণের বিশেষ ভমিকা রাখে। হাঁপানিতে ফুসফুসের শ্বাসনালীতে বাধাজনিত সমস্যা ধরা পড়ে।  এছাড়া এক্সারসাইজ টেস্টিং ব্রংকোএলভিওলর ল্যাভাজ,  লাঙ্গ বায়োপসি করে আমরা এ রোগের সন্ধান পাই। দুর্ভাগ্যজনক কথা, হলো- এ রোগের ব্যাপকভাবে চিকিৎসা না করলে শতকরা ৫০ জন রোগী ৫ বছরের মধ্যে মারা যায়। নিজে নিজে কখনো এ রোগ সারে না। শতকরা ৭৫ ভাগ ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টজনিত কারণেই রোগী মারা যায়। অনেক সময় শতকরা ১০ ভাগ ক্ষেত্রে এই রোগের সাথে ফুসফুসের ক্যান্সার দেখা যায়। এটা বলা খুব একটা সম্ভবপর নয় যে,  কোন রোগী চিকিৎসায় ভালে হয়ে যাবে ? তবে নিম্নলিখিত অবস্থানের রোগী ভাল হয়ে যাওয়ার আশা প্রচুর। যেমন অল্প বয়স, মহিলা, কম শ্বাসকষ্ট থাকলে,  এক্সরেতে কম দাগ থাকলে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ ঠিকমত থাকলে। চিকিৎসা সাধারণত তিন ভাগে হয়ে থাকে। যেমন- ওষুধগুলো হল স্টেরয়েড, সাইটোটস্কিক ওষুধ এবং অন্যান্য (পেনসিলামিন)। তারপর আসে লক্ষণ বুঝে চিকিৎসা ও তারপর আসে একটি ফুসফুস পরিবর্তন বা সিঙ্গল লাঙ্গ ট্রান্সপ্লানটেশন। সবশেষে কথা হলো যেহেতু এ রোগটি একটি শ্বাসকষ্টজনিত বক্ষব্যাধি এবং যেহেতু এই রোগের হার ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে,  তাই একে হাপানি বলে গুরুত্ব দেয় না। একবার শেষ পর্যায়ে রোগী চিকিৎসকের কাছে আসলে সমস্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন করে এ রোগের চিকিৎসা দিলে অনেকটা ভাল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মনে রাখবেন,  শ্বাসকষ্ট মানেই সাধারণ হাঁপানি নয়। যে কোন বক্ষব্যাধিতেই শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।

 

অধ্যাপক ডাঃ ইকবাল হাসান মাহমুদ

বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ

৮৫, ওয়ালেস মোড়,  বড় মগবাজার, ঢাকা।